প্রিন্ট এর তারিখ: ১৬ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ: ১৬ জুন ২০২৬||
প্রিন্ট এর সময়:
১১:৪৮ এএম ||
বিদ্যালয়ের ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তোপের মুখে প্রধান শিক্ষক জহির
আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ ||
কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মুকবেকী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।রোববার (১৫ জুন) বিকেল সাড়ে ২টায় বিদ্যালয়ে সরেজমিন তদন্ত করেন কুতুবদিয়া উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুসলেম উদ্দিন। স্থানীয় বাসিন্দা নুর মোহাম্মদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে এ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়।অভিযোগকারী নুর মোহাম্মদ জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলাম নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। উপস্থিত হলেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে অধিকাংশ সময় বিদ্যালয়ের পাশের চায়ের দোকান কিংবা মুদির দোকানে আড্ডা দিতে দেখা যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।অভিযোগে আরও বলা হয়, শিশু শ্রেণি পরিচালনা, ওয়াশ ব্লক রক্ষণাবেক্ষণ, রুটিন মেইনটেইনসহ বিভিন্ন খাতে বিদ্যালয়টি প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান পেয়ে থাকে। ২০১৮ সালে যোগদানের পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাত বছরে এসব খাতে প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ এলেও বিদ্যালয়ের দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। বরং বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অবস্থা দিন দিন আরও নাজুক হয়েছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক দীর্ঘদিন ধরে অচল ও ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছর ওয়াশ ব্লকের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।শিশু শ্রেণির অবস্থা আরও করুণ। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কোনো মানসম্মত কার্পেট নেই। বছরের পর বছর ধরে একটি পুরনো, ছেঁড়া ও নোংরা চটের ওপর বসে পাঠ গ্রহণ করতে হচ্ছে শিশুদের। শ্রেণিকক্ষে নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী, খেলনা কিংবা আকর্ষণীয় পরিবেশ। অথচ শিশু শ্রেণির জন্য প্রতি বছর সরকারি অনুদান বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও সেই অর্থের কোনো সুফল শিক্ষার্থীরা পায়নি বলে অভিযোগ।এছাড়া জাতীয় দিবস ও সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালনের জন্য প্রতিবছর বরাদ্দ এলেও বিদ্যালয়ে সেসব কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের নজির নেই বলে অভিযোগকারীর দাবি।সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ের মাঠের বড় বড় ইউক্যালিপটাস গাছ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেটে বিক্রি করার ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব গাছ বিক্রি করে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য প্রায় ২ লাখ টাকা বরাদ্দ পেলেও নিম্নমানের খেলনা নির্মাণের মাধ্যমে অধিকাংশ অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার নিম্নমানের খেলনা সরবরাহ করা হয়, যা নির্মাণের অল্পদিনের মধ্যেই ভেঙে অকার্যকর হয়ে পড়ে।সব মিলিয়ে ৭ বছরে তিনি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যালয়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) ও পিটিএসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিকে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, জবাবদিহিতা এড়াতেই পরিকল্পিতভাবে এসব কমিটি নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের নজরদারি ছাড়াই অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়া যায়।অভিযোগকারী নুর মোহাম্মদ বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি অর্থ কোথায় গেল, তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।তদন্ত চলাকালে মহেশখালী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ওমর ফারুক, বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম এবং অন্যান্য শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথিপত্র, হিসাব-নিকাশ ও স্থাপনা ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন।তদন্ত শেষে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুসলেম উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, অভিযোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।এদিকে বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের অপব্যবহারের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন স্থানীয় জনগণ ও অভিভাবকদের নজর তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে-প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের শেষ পরিণতি কী হয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রকসী সিকদার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ