প্রিন্ট এর তারিখ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ: ০৩ আগস্ট ২০২৬||
প্রিন্ট এর সময়:
০৯:০৩ এএম ||
রোমাঞ্চের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ!
আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ ||
প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা, একের পর এক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগের মধ্যেও কক্সবাজারের দরিয়ানগর সৈকতে চলছিল প্যারাসেইলিং। শেষ পর্যন্ত সেই ‘রোমাঞ্চের’ বলি হলেন পর্যটক সৌভিক রায় (৩০)। মাঝ আকাশে প্যারাসেইলিংয়ের রশি ছিঁড়ে সমুদ্রে পড়ে প্রাণ হারানোর ঘটনায় ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এর মালিক মো. ফরিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে।রোববার (২ আগস্ট) নিহতের বোন মেধা মৃত্তিকা রায় বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলায় ফরিদকে প্রধান আসামি করে আরও ৪/৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শনিবার দুপুরে দরিয়ানগর সৈকতে বেড়াতে গিয়ে ফরিদের পরিচালিত প্যারাসেইলিংয়ে ওঠেন সৌভিক। অপর্যাপ্ত ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে মাঝ আকাশে প্যারাসেইলিংয়ের রশি ছিঁড়ে তিনি সমুদ্রে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী বা লাইফগার্ড না থাকায় উদ্ধারে বিলম্ব হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।এজাহারে আরও বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার ভিডিও ফুটেজেও প্যারাসেইলিং পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে।এদিকে শৌভিকের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কীভাবে প্যারাসেইলিং চললজেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত ২৭ জুলাই থেকেই দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় সব ধরনের প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী কোনো প্রতিষ্ঠানই লাইসেন্স নিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছিল না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইজারার ভিত্তিতে কার্যক্রম চালালেও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করা হয়নি।অর্থাৎ প্রশাসনের নির্দেশ ছিল কার্যক্রম বন্ধ রাখার, অথচ সেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই প্যারাসেইলিং চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফরিদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আর সেই কার্যক্রমেই প্রাণ হারালেন এক পর্যটক।সৌভিক রায়ের মৃত্যুর ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। গত প্রায় এক দশকে ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’-এর প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে সমুদ্রে পড়ে, ঝাউবাগানে আটকে কিংবা বালুচরে পড়ে অন্তত ১৯ পর্যটক আহত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে এক নারী পর্যটক রশি ছিঁড়ে প্যারাসেইলিংসহ সমুদ্রে পড়ে আহত হন। একই মাসে আরেক নারী পর্যটক প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে ঝাউবাগানের গাছের ডগায় আটকে যান। এর আগে ২০ মে একই সৈকতে প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন আরেক পর্যটক।গত জুলাই মাসেও প্যারাসেইলিং উড্ডয়নের সময় কয়েকজন পর্যটক আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।একাধিক দুর্ঘটনার পরও স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া এবং বারবার কার্যক্রম চালু হওয়ার ঘটনায় এখন প্রশাসনিক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানিয়েছেন, সৈকতে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নেই এবং প্যারাসেইলিং পরিচালনার বিষয়ে তাদের কাছ থেকেও কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি।ফলে সমুদ্রে কোনো পর্যটক পড়ে গেলে দ্রুত উদ্ধারের জন্য বাইরে থেকে ডুবুরি আনতে হয়। উচ্চঝুঁকির একটি বিনোদনমূলক কার্যক্রমে এমন দুর্বল উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টুয়াক) উপদেষ্টা মফিজুর রহমানের অভিযোগ, পর্যাপ্ত প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছে। টাকার লোভে কিছু ব্যবসায়ী পর্যটকদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।টুয়াক সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, প্যারাসেইলিং পর্যটনের আকর্ষণ হতে পারে, তবে সেটি আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই পরিচালনা করতে হবে।পর্যটক নিহত হওয়ার পর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচ কর্মী ও পৌরসভার সহযোগিতায় ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’-এর সরঞ্জাম ও মালামাল জব্দ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের তৈরি অবৈধ স্থাপনাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফরিদ আত্মগোপনে চলে গেছেন। তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।এদিকে প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম।রোববার বাংলাদেশ পর্যটন ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কর্মকর্তাদের কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।মন্ত্রী কক্সবাজারসহ সারাদেশে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।উল্লেখ্য, শৌভিক রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপারকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রকসী সিকদার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ