প্রিন্ট এর তারিখ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ: ২০ আগস্ট ২০২৬||
প্রিন্ট এর সময়:
০৫:১১ এএম ||
বন বিভাগের আপত্তিতে দুর্ভোগে মহেশখালীর অর্ধলক্ষ মানুষ
আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ ||
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সংরক্ষিত বনভূমির মধ্য দিয়ে সড়ক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বন বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিরোধ। আইনি জটিলতায় প্রায় ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকার একটি সড়ক প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কালারমারছড়া ও শাপলাপুরসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ।‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প’ (এসসিআরডিপি)-এর আওতায় জে. এম. ঘাট-কালারমারছড়া সংযোগ সড়কটি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তি এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের আদেশে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট সড়কটির নির্মাণকাজে দুই মাসের অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। ফলে চলমান সংস্কার ও নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে।চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম এ হাসানের ভাষ্য, ১৯৫৭ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী মহেশখালী পাহাড় মৌজার প্রায় ১৮ হাজার ২৮৬ একর এলাকা সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত। এ এলাকায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণ আইনসঙ্গত নয়।বন বিভাগের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত প্রায় ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের ফলে পাহাড় কাটার পাশাপাশি বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন সড়ককে কেন্দ্র করে বনভূমিতে অবৈধ দখলও বাড়তে পারে।এদিকে এলজিইডির মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি অবশ্য বন বিভাগের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাঁর দাবি, সড়কটি সরকারি গেজেটভুক্ত এবং স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির ভিত্তিতেই জাইকার অর্থায়নে এটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়েছে।বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ বন্ধ হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।ভাঙা সড়কে দুর্ভোগ: বর্তমানে কালারমারছড়া-শাপলাপুরের পুরোনো সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্রায় ৪ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির বিভিন্ন অংশে দুই পাশের মাটি ধসে গিয়ে চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি জরুরি প্রয়োজনে রোগী পরিবহনও কঠিন হয়ে পড়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এই পথটি সংস্কার না হলে বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কোলে করে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তাঁরা।প্রবীণ বাসিন্দা ছৈয়দ উল করিম, বদন আলী ও মো. নুরুল আলমের অভিযোগ, পুরোনো যোগাযোগপথটি সংস্কারের বদলে এটিকে নতুন করে পাহাড় কেটে নির্মাণের উদ্যোগ হিসেবে দেখায় স্থানীয়দের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।সড়কটি বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। মহেশখালী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম দেওয়ান ও সমাজকর্মী এ এম হোবাইব সজীবের অভিযোগ, বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, সাধারণ মানুষের যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে না।তবে পরিবেশকর্মীদের কেউই বন রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছেন না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহেশখালী শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দীক মনে করেন, পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ করে সড়কটির জন্য বিকল্প প্রকৌশল পদ্ধতি বের করা যেতে পারে। পাহাড় ও বনভূমির ক্ষতি কমিয়ে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব, যাতে একই সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের প্রয়োজন এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।সড়কটির গুরুত্ব শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান জানান, দুর্গম এলাকাগুলোতে দ্রুত পুলিশি সেবা পৌঁছে দিতে ভালো যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। সড়কটি দুর্বল থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।এ অবস্থায় স্থানীয়দের দাবি, আদালতের আদেশ ও বন আইনের বিষয়গুলো মেনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে হবে। বনভূমির ক্ষতি না করে পুরোনো পথটির উন্নয়ন, বিকল্প রুট নির্ধারণ কিংবা পরিবেশবান্ধব প্রকৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রকসী সিকদার
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ