প্রিন্ট এর তারিখ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ: ২৫ আগস্ট ২০২৬||
প্রিন্ট এর সময়:
১২:১৯ পিএম ||
আব্দুল্লাহ আল ফরহাদ ||
কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বাস্তবায়িত মানবিক সহায়তা প্রকল্পের সমাপনী সভা ও Lesson Learned Workshop অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) ২০২৬ সকাল ১০টায় চকরিয়া উপজেলা পরিষদ হল রুমে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের আয়োজনে এবং Start Fund Bangladesh-এর অর্থায়নে “Humanitarian Assistance to the Flood Affected People of Chakaria & Pekua Upayilas under Cox's Bayar District” শীর্ষক প্রকল্পের সমাপনী এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ১৪ জুলাই ২০২৬ থেকে ২৭ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্পের টিম লিডার আব্দুল আলিম। সভার উদ্বোধন করেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) জনাব শাহীন দেলোয়ার এবং সভাপতিত্ব করেন চকরিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জনাব শফিউল আলম। প্রকল্পের কার্যক্রম ও অর্জন তুলে ধরেন প্রকল্পের ফোকাল পারসন জনাব মোঃ শহিদুল ইসলাম। প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন অভিজ্ঞতা, অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে লার্নিং শেয়ারিং করেন MEAL and HACE Officer জনাব মামুনুর রশিদ। প্রকল্পের MAAP Focal জনাবা আনোয়ারা খাতুন প্রকল্পের কার্যক্রম মনিটরিং, উপকারভোগীদের মতামত ও ফিডব্যাক সংগ্রহ, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং প্রকল্পের মান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকল্পের চকরিয়া উপজেলার মাঠপর্যায়ের সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয় ও বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা সমন্বয়কারী জনাব মোঃ মামুন গাজী, সুশীলন, চকরিয়া, কক্সবাজার।প্রকল্পটি এমন এক সময়ে বাস্তবায়িত হয়, যখন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, গৃহপালিত পশু এবং স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দুর্যোগ-পরবর্তী সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জরুরি প্রয়োজন পূরণ এবং স্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবনযাপনে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রকল্পটির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।Start Fund Bangladesh-এর অর্থায়নে সুশীলনের মাঠপর্যায়ের সরাসরি বাস্তবায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির আওতায় চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মোট ১,০০০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং বরইতলী ইউনিয়নের ১ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মোট ৫০০টি পরিবার প্রকল্পের আওতায় সহায়তা পেয়েছে। পাশাপাশি পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ও টইটং ইউনিয়নেও প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়।প্রতিটি নির্বাচিত পরিবারকে ৮,০০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। এ হিসাবে প্রকল্পের আওতায় মোট ৮০ লাখ টাকা নগদ সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে একটি করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা উপকরণ সম্বলিত হাইজিন কিট প্রদান করা হয়।হাইজিন কিটে ছিল খাবার পানি সংরক্ষণের কন্টেইনার, প্লাস্টিক বালতি, মগ, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ডিটারজেন্ট পাউডার, ব্লিচিং পাউডার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, গায়ে মাখা সাবান, খাবার পানি ও খাবার স্যালাইন। এসব উপকরণ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করে নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উপকার পেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে সুশীলনের কর্মীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কড়ইড় ঝঁৎাবু-এর মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাই করে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী উপকারভোগীর তালিকা প্রস্তুত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমোদন সাপেক্ষে তালিকা চূড়ান্ত ও প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোকে সহায়তার আওতায় আনার পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।নগদ সহায়তা পাওয়ার পর উপকারভোগীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করেন। কেউ ঘরবাড়ি মেরামত করেছেন, কেউ চিকিৎসা ব্যয় মিটিয়েছেন, আবার কেউ গৃহপালিত পশুর খাবারসহ পরিবারের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এই অর্থ ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি হাইজিন কিটের উপকরণগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।প্রকল্পের আওতায় শুধু নগদ অর্থ ও সামগ্রী বিতরণেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ পানি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, সুরক্ষা, জবাবদিহিতা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মাঠপর্যায়ে কমিউনিটি ভলেন্টিয়ারদের সম্পৃক্ত করে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের মতামত ও প্রয়োজনকে কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হয়।নগদ সহায়তার বাস্তব প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে প্রকল্পের একজন উপকারভোগী প্রতিবন্ধী হাবিবুল্লাহ মেজবাহ বলেন, “আমি এই নগদ টাকা পেয়ে আমার চিকিৎসা করিয়েছি, মাথার সিটি স্ক্যান করিয়েছি এবং ঘরও ঠিক করেছি। আমার এত বড় উপকার হয়েছে যে তা বলে বোঝাতে পারব না। আমি অন্ধ মানুষ, আয়-রোজগার করতে পারি না। এই সহায়তা আমার জন্য অনেক বড় উপকার হয়েছে।”আরেক উপকারভোগী সাবিত্রী বালা বলেন, “অসুস্থ স্বামী ও প্রতিবন্ধী নাতিকে নিয়ে খুব অসহায় জীবনযাপন করছিলাম। এই নগদ টাকা এবং হাইজিন কিটে দেওয়া সামগ্রী আমার অনেক উপকারে এসেছে। তাদের চিকিৎসা, খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কিছুদিনের জন্য মেটাতে পেরেছি। এই সহায়তা আমাদের মতো অসহায় পরিবারের জন্য অনেক বড় স্বস্তি।”সভায় ২নং বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান সুশীলনের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে দুর্যোগকবলিত এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এসব এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলে প্রকৃত অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আরও বেশি উপকৃত হবে।চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) জনাব শাহীন দেলোয়ার প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মানবিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু উপকারভোগীদের নয়, পুরো কমিউনিটির মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন। স্থানীয় মানুষের বাস্তব প্রয়োজন ও অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।সমাপনী সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, অর্জন, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতে দুর্যোগকালীন মানবিক সাড়া কার্যক্রম আরও কার্যকর করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। মাঠপর্যায়ে দ্রুত প্রয়োজন নিরূপণ, স্বচ্ছভাবে উপকারভোগী নির্বাচন, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয়, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি প্রয়োজন পূরণের অভিজ্ঞতাগুলো ভবিষ্যৎ মানবিক কার্যক্রমে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী জনাব মোঃ জুয়েল রানা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী জনাব ইফতেখারুল আলম, সুশীলনের সিনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার ও প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত জনাব মোঃ আখতারুজ্জামান, বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মন্ডু কুমার বড়ুয়া, কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুর আলম, ২নং বরইতলী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মিস খালেদা বেগম, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, কমিউনিটি ভলেন্টিয়ারসহ সংশ্লিষ্টরা। আলোচনা শেষে প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কমিউনিটি ভলেন্টিয়ার, উপকারভোগী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানো হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব শাহীন দেলোয়ার সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সুশীলনের মানবিক সহায়তা প্রকল্পের সমাপনী সভা ও Lesson Learned Workshop-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেন।