ঢাকা    শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক


ঘুষের অভিযোগ প্রকাশের পরই খামারির বিরুদ্ধে নাশকতা মামলা,

​নিজের ঘাম ঝরানো উপার্জনে গড়ে তোলা খামারে চুরির ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে একজন সাধারণ উদ্যোক্তা যে এভাবে প্রশাসনিক রোষানলের চরম শিকারে পরিণত হবেন, তা হয়তো কারও ভাবনায় ছিল না। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামের ডেইরি ও কৃষি উদ্যোক্তা নুরুল আলম চুরির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশায় পুলিশের শরণাপন্ন হয়েও প্রতিকার পাননি। উল্টো তদন্তের গতি ইতিবাচক রাখার অজুহাতে তাঁর কাছে কয়েক দফায় টাকা দাবি করা হয়। বাধ্য হয়ে সেই ঘুষ দাবির সত্য ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে। তবে সেই প্রতিবাদের চরম মাশুল গুনতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগী নিজেই। ঘুষের ঘটনা জনসম্মুখে আসার ঠিক দুই দিনের মাথায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি নাশকতার মামলায় প্রধান আসামিদের পাশাপাশি আসামি হিসেবে নাম উঠে এসেছে এই সাধারণ খামারির। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই আকস্মিক পদক্ষেপে ভুক্তভোগী পরিবার চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এবং এ ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিশোধমূলক বলে দাবি করা হচ্ছে।​ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা যায়, গত সাতই জুলাই রাতে নুরুল আলমের মালিকানাধীন ‘জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড এগ্রো ফার্ম’-এ এক দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা ঘটে। লোকসানের মুখে পড়া এই উদ্যোক্তা প্রতিকার ও মালামাল উদ্ধারের আশায় গত ২৬ জুলাই বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় রামদাস মুন্সির হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক এসআই সুমন কবির মৃধার ওপর। কিন্তু ভুক্তভোগী নুরুল আলমের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর থেকেই তদন্ত কর্মকর্তা সুমন কবির মৃধা তাঁর অনুকূলে প্রতিবেদন দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষ দাবি করতে থাকেন। নিরুপায় হয়ে নুরুল আলম দুই দফায় মোট চার হাজার ৫০০ টাকা প্রদেয় হিসেবে হস্তান্তর করেন। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত না হয়ে পরবর্তীতে ওপরস্থ কর্মকর্তাকে দিতে হবে অজুহাত তুলে আরও পাঁচ হাজার টাকা দাবি করা হয়।​অন্যায় দাবির মুখে নতিস্বীকার না করে ভুক্তভোগী খামারি ঘুষ দাবির বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় ও প্রশাসনিক অস্বস্তি তৈরি হলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ প্রশাসন তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। গত ২৮ আগস্ট অভিযুক্ত এসআই সুমন কবির মৃধাকে তাঁর দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে বিচার পাওয়ার আশা জাগলেও ঘটনার মোড় ঘোরে ঠিক দুদিন পর, অর্থাৎ ৩০ আগস্ট। সেদিন পার্শ্ববর্তী আনোয়ারা থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় নুরুল আলমকে ৫২ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তাঁকে নানাভাবে নাশকতার মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ ছিল নুরুল আলমের। হঠাৎ আনোয়ারার বরুমছড়া রাস্তার মাথা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে দায়ের করা এই মামলায় তাঁর নাম উঠে আসার সময়ক্রম পুরো ঘটনাটিকে চরম সন্দেহজনক করে তুলেছে।​ভুক্তভোগী নুরুল আলমের জোরালো দাবি, ঘটনার দিন ও সময়ে তিনি আনোয়ারা তো দূরের কথা, নিজের খামার ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সংবাদ প্রকাশের পরপরই প্রতিহিংসাবশত তাঁকে নাশকতার মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আনোয়ারা থানায় দায়ের করা নাশকতার মামলার বাদী এসআই ইমাম হোসেন এবং সাময়িক প্রত্যাহার হওয়া এসআই সুমন কবির মৃধা একই ব্যাচের কর্মকর্তা এবং তাঁদের মধ্যে নিবিড় ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। সহকর্মীকে প্রশাসনিক শাস্তির মুখে ফেলার প্রতিশোধ নিতেই এই সাজানো ছক তৈরি করে নির্দোষ একজন মানুষকে নাশকতার মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীর।ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, নিজের এবং পরিবারের পূর্ণ নিরাপত্তা চেয়ে এবং মামলায় নাম অন্তর্ভুক্তির পেছনের কারণ খতিয়ে দেখার জন্য চলতি মাসের ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কমপ্লেইন সেলে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন নুরুল আলম। এর আগের দিন তিনি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের কাছেও অনুরূপ লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। আবেদনের স্বপক্ষে নুরুল আলম নিজের মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন ও কল ডিটেইলস রেকর্ড যাচাই করার জোরালো দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ওই সময়ের কল রেকর্ড পর্যালোচনা করা হলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে ৩০ আগস্টের কথিত নাশকতার সময় তাঁর মূল অবস্থান কোথায় ছিল এবং কীভাবে একজন নির্দোষ খামারিকে মামলার আসামি বানানো হয়েছে।​অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। আনোয়ারা থানার মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ইমাম হোসেন জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ভুক্তভোগী নুরুল আলম যদি কোনো অপরাধে জড়িত না থাকেন তবে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগতভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তা সুমন কবির মৃধাকে চেনার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, কারও সাথে শত্রুতা রেখে মামলা করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘুষের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং আনোয়ারা থানার মামলাটি আলাদা একটি আইনি প্রক্রিয়া, যার সাথে আগের ঘটনার সরাসরি সংযোগ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।​চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, নুরুল আলমের লিখিত আবেদনটি পাওয়া গেছে এবং আনোয়ারা সার্কেলকে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ প্রদান করা হবে। পুলিশ প্রশাসনের ভাষ্যমতে, মামলায় নাম আসাই কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে না এবং তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিলের আগেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

ঘুষের অভিযোগ প্রকাশের পরই খামারির বিরুদ্ধে নাশকতা মামলা,