স্বেচ্ছায় শ্মশানের জন্য বসতবাড়ির জায়গা ছেড়ে দিয়ে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা একটি জায়গা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্মশানের জন্য জায়গাটি দখলমুক্ত করে দিয়েছেন এক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ।
শনিবার (৬ জুন) বিকেল ৩টার দিকে উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের সবুজপাড়া এলাকায় এ দখলমুক্তকরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। পরে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে জায়গাটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে শ্মশান হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত জায়গাটির একটি অংশে শ্মশানের জায়গার এক পাশে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ওই প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ তার পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা হলে তিনি সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বেচ্ছায় জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার এই উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বলেন,শ্মশানের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল। প্রতিবন্ধী বৃদ্ধের মহানুভব সিদ্ধান্তের ফলে সেই সংকট দূর হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। তারা এ জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসাইনের মধ্যস্থতায় শ্মশানের জায়গাটি হস্তান্তর চুড়ান্ত হয়। এ সময় ইকবাল হোসাইন বলেন,"ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিবন্ধী বৃদ্ধের এই আত্মত্যাগ ও উদারতা সমাজে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেবে এবং অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন,বর্তমান সরকারের সম্প্রীতির যে উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ শাহ আলম ভূমিকা রাখায় আশা রাখছি আগামীতে সরকার এই পরিবারের পাশে থাকবে। ইতোমধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবন্ধী শাহ আলমকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
স্থানীয় সনাতন ধর্মীয় নেতা এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন—"আমরা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ওই প্রতিবন্ধী বৃদ্ধের মহানুভবতাকে স্মরণ করছি। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের ধর্মীয় প্রয়োজন ও অধিকারকে সম্মান জানিয়েছেন। বর্তমান সময়ে এমন উদার ও মানবিক দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। তাঁর এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি শ্মশানের জায়গা দখলমুক্ত করার ঘটনা নয়, এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবতার এক অনন্য নজির।"
তিনি আরও বলেন,"আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর এই মহৎ উদ্যোগ সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্যের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হয়েও তিনি যে ত্যাগ ও সহমর্মিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের সকলের জন্য শিক্ষণীয়। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করছি এবং তাঁর এই অবদান সনাতন ধর্মাবলম্বী সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।"
এ বিষয়ে প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ শাহ আলম বলেন—"আমি মনে করি, ধর্মীয় উপাসনা ও শেষকৃত্যের স্থান প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। দীর্ঘদিন ধরে এই জায়গা নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা ছিল। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাইদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে আমি স্বেচ্ছায় জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে যদি তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালিত হয়, সেটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দ। আল্লাহর এই দুনিয়ায় আমার পরিবারের জন্য একটি জায়গা কোন না কোন স্থানে হয়ে যাবে। আমার আরেক মুসলিম ভাই শ্মশানে একটু দুরে এক টুকরো জায়গা দিয়েছে সেখানে আমি স্থানাস্তর হচ্ছি।
তিনি আরও বলেন,"আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক। ভিন্ন ধর্মের হলেও আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার। সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আমি চাই, সবাই মিলেমিশে বসবাস করুক এবং একে অপরের ধর্মীয় অধিকারকে সম্মান করুক।"
এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়রা মনে করেন, ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ যে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন, তা পেকুয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ