চেয়ারম্যানকে নোটিশ না দিলেই কি তালাক অকার্যকর? আদালতের যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গি ও আইনি বাস্তবতা
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার পর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া এবং অপর পক্ষকে তার অনুলিপি পাঠানো বাধ্যতামূলক । সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে— এই নোটিশ না দিলে বা নোটিশ পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তালাক কখনোই কার্যকর হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট করেছেন যে, শুধুমাত্র নোটিশ না দেওয়ার অজুহাতে বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে একটি সুস্পষ্ট তালাক অকার্যকর হয়ে যায় না । সম্প্রতি দেশের বহুল আলোচিত ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানার মামলা এবং উচ্চ আদালতের পুরনো কিছু ‘কেইস ল’ (Case Law) এই আইনি বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
মূল আইনি সংকট ও ধারা ৭-এর অপব্যবহার
১৯৬১ সালের আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল যত্রতত্র মুখে মুখে তিন তালাক (তালাকে বিদাত) বন্ধ করা এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপসের একটি রাষ্ট্রীয় সুযোগ তৈরি করা । আইনের ৭(৪) ধারা অনুযায়ী, নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয় ।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রী স্বেচ্ছায় এফিডেভিট বা কাজীর মাধ্যমে তালাক সম্পন্ন করার পরও দেনমোহর ফাঁকি দিতে, দ্বিতীয় বিয়েকে অবৈধ প্রমাণ করতে কিংবা অন্য পক্ষকে হেনস্তা করতে আদালতে দাবি করেন— "যেহেতু চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া হয়নি, তাই তালাক হয়নি।" আদালত এই ধরণের অসৎ উদ্দেশ্য ও আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। নিচে এ সংক্রান্ত প্রধান কেইস ল-গুলোর মূল উদ্দেশ্য ও আদালতের সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হলো:
১. সিরাজুল ইসলাম বনাম হেলেনা বেগম [48 DLR (HCD) 48]
মামলার প্রেক্ষাপট: এই মামলায় স্বামী এফিডেভিটের মাধ্যমে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর, স্ত্রী যখন দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবি করেন, তখন স্বামী চতুরতার আশ্রয় নেন। তিনি দাবি করেন, তিনি চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেননি বলে তালাক কার্যকর হয়নি, তাই তিনি দেনমোহর দেবেন না।
কেইস ল-এর আইনি উদ্দেশ্য (Legal Objective): “No one can take advantage of his own wrong)—এই সর্বজনীন আইনি নীতি প্রতিষ্ঠা করা।
আদালতের সিদ্ধান্ত: উচ্চ আদালত স্বামীর এই দাবি সরাসরি খারিজ করে দেন। আদালত রায় দেন যে, স্বামী নিজেই নোটিশ না দেওয়ার মতো বেআইনি কাজ করে, পরবর্তীতে সেই নোটিশের অনুপস্থিতিকে ঢাল বানিয়ে নিজের দেওয়া তালাককে অস্বীকার করতে পারেন না। যখন হলফনামার মাধ্যমে তালাকের চূড়ান্ত অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে, তখন নোটিশের ত্রুটি থাকলেও তা স্ত্রীর অধিকার হরণের কারণ হতে পারে না।
২. নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানার মামলা (সাম্প্রতিক নজির)
মামলার প্রেক্ষাপট: তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হাসান দণ্ডবিধির ৪৯৪ (দ্বি-বিবাহ) ও ৪৯৭ (ব্যভিচার) ধারায় মামলা করে দাবি করেছিলেন যে, তামিমা তাকে আইনগতভাবে তালাক না দিয়েই নাসিরকে বিয়ে করেছেন। রাকিবের মূল অস্ত্র ছিল— তিনি বা ইউপি চেয়ারম্যান তালাকের কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাননি।
কেইস ল-এর আইনি উদ্দেশ্য (Legal Objective): এই মামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল "পক্ষগণের আচরণ ও দীর্ঘদিনের বাস্তব বিচ্ছেদকে প্রক্রিয়াগত ত্রুটির চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া" (Conduct and Fact of Separation over Procedural laws)
আদালতের সিদ্ধান্ত: বিবাদী পক্ষ আদালতে ‘সিরাজুল ইসলাম বনাম হেলেনা বেগম’ মামলার নজিরটি উপস্থাপন করেন। আদালত উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে দেখেন যে, তামিমা ২০১৬ সালেই সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন এবং পাসপোর্টে বৈবাহিক অবস্থা পরিবর্তনসহ তার পরবর্তী আচরণে বিচ্ছেদের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। আদালত রায় দেন যে, নোটিশের সামান্য ত্রুটি বা প্রশাসনিক গাফিলতির জন্য একটি বাস্তব বিচ্ছেদকে অস্বীকার করে নতুন বিয়েকে ‘ব্যভিচার’ বলা যায় না। ফলে আদালত নাসির ও তামিমাকে এই মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস (Acquittal) প্রদান করেন।
৩. খুরশীদ বিবি বনাম মুহাম্মদ আমিন [PLD 1967 SC 97]
মামলার প্রেক্ষাপট: এই উপমহাদেশীয় প্রাচীন মামলায় স্ত্রী কর্তৃক তালাক বা বিচ্ছেদের পর নোটিশ সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
কেইস ল-এর আইনি উদ্দেশ্য (Legal Objective): এই রায়ের উদ্দেশ্য ছিল "আইনের কার্যকারিতাকে কেবল কাগজের আনুষ্ঠানিকতায় বন্দী না রেখে সম্পর্কের বাস্তব রূপকে স্বীকৃতি দেওয়া"।
আদালতের সিদ্ধান্ত: আদালত প্রথম দেখান যে, তালাকের ক্ষেত্রে নোটিশ একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। যদি স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক মানসিকভাবে ও বাস্তবে চিরতরে ভেঙে যায়, তবে নোটিশের অভাব সেই বাস্তবতাকে বদলে দিতে পারে না এবং জোর করে একটি মৃত সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখা যায় না।
৪. লুৎফুন্নাহার বনাম শামসুল আলম [১৩ বিএলডি]
মামলার প্রেক্ষাপট: এই মামলায় তালাক হওয়ার পর দীর্ঘদিন পক্ষদ্বয় আলাদা ছিলেন এবং চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তির সনদ ইস্যু করা হয়নি।
কেইস ল-এর আইনি উদ্দেশ্য (Legal Objective): এই রায়ের উদ্দেশ্য ছিল "দীর্ঘমেয়াদী পৃথক বসবাস এবং সামাজিক বাস্তবতাকে আইনি বৈধতা দেওয়া"।
আদালতের সিদ্ধান্ত: আদালত স্পষ্ট করেন, পক্ষগণের দীর্ঘদিনের পৃথক বসবাস এবং আচরণের মাধ্যমে যদি প্রমাণিত হয় যে তারা বিবাহবিচ্ছেদ মনে-প্রাণে মেনে নিয়েছেন, তবে চেয়ারম্যানের নোটিশের চূড়ান্ত সনদ বা প্রত্যয়নপত্র না থাকলেও আদালত সেই তালাককে বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন।
সামাজিক বার্তা
আদালতের এই প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ এই নয় যে মানুষ চেয়ারম্যানকে নোটিশ দেওয়া বন্ধ করে দেবে। নোটিশ দেওয়া অবশ্যই একটি আইনি দায়িত্ব এবং প্রথম কর্তব্য । তবে আদালতের এই রায়গুলোর মূল বার্তা হলো— আইনের কোনো প্রক্রিয়াগত ধারাকে (Procedural Law) যেন কেউ অন্যায় সুবিধা আদায়ের বা অন্য পক্ষকে ব্ল্যাকমেইল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।
আইন চলে ন্যায়ের নীতিতে। যখন দলিল ও বাস্তব আচরণ দিয়ে প্রমাণ হয়ে যায় যে একটি বিয়ে ভেঙে গেছে, তখন নোটিশের কাগজের অজুহাতে সেই মৃত সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখা এবং পরবর্তী নতুন সংসারকে অবৈধ ঘোষণা করা আইনের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। উচ্চ আদালতের এই চমৎকার ও বাস্তবমুখী ব্যাখ্যা দেশের হাজারো ভুক্তভোগী নারী ও পুরুষকে আইনি হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ