একসময় কক্সবাজার জেলা কারাগারের নাম উচ্চারিত হলেই নানা অনিয়ম, হয়রানি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসত। নিয়মের বাইরে সাক্ষাৎ, মোবাইল ও ব্যাগ সংরক্ষণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানিসহ নানা ঘটনার অভিযোগ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্রে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
বিশেষ করে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে জেল সুপার হিসেবে ২৮তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা মোঃ ওবায়দুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একের পর এক কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কারাবন্দিদের স্বজন, দর্শনার্থী এবং সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা কারাগার সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের প্রবেশ থেকে শুরু করে বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎÑসবক্ষেত্রেই নির্ধারিত বিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। আগের মতো কোনো দালালচক্রের আনাগোনা কিংবা নিয়মবহির্ভূত সুযোগ-সুবিধার দৃশ্য চোখে পড়েনি।
কারাবন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত সময় ও নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মের বাইরে কাউকে সুযোগ দিচ্ছেন না। দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে। আগে কারাগারে প্রবেশের সময় দর্শনার্থীদের মোবাইল ফোন, ব্যাগসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাইরে নির্দিষ্ট দোকানে জমা রাখতে হতো। এজন্য অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় করতে হতো বলে অভিযোগ ছিল। বর্তমানে কারা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসব সামগ্রী নিরাপদে সংরক্ষণ করছে এবং এর জন্য কোনো ধরনের অর্থ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ যেমন আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি হয়রানিও কমেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতে অর্থের বিনিময়ে নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়ার অভিযোগ ছিল। বর্তমানে সেই সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন কারা বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
কারাগারে আসা একাধিক দর্শনার্থী জানান, কয়েক বছর আগের পরিবেশের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির অনেক পার্থক্য রয়েছে। এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কাউকে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় তথ্যও সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি কারাগারে এক স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা আজিজা বেগম বলেন, কয়েক বছর আগের কক্সবাজার জেলা কারাগারের পরিবেশ আর বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আগে কারাগারে এলেই এক ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাজ করত। নানা ধরনের হয়রানি, দালালচক্রের উৎপাত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। সবকিছু নিয়ম-নীতির মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। দর্শনার্থীদের অযথা হয়রানি করা হচ্ছে না, প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনাও সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান পরিবেশে এসে আগের তুলনায় অনেক স্বস্তি অনুভব করছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান জেল সুপার দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নিয়মিত তদারকি, সেবার মান উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারাগারের প্রতিটি কার্যক্রম যেন বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রেখেছেন। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এদিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। এসব অভিযোগের পর বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বর্তমান জেল সুপার মোঃ ওবায়দুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই সংস্কার কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কারা প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বন্দিদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও মানবিক সেবার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত তদারকি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দর্শনার্থীদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা বাড়ানোর মাধ্যমে একটি আধুনিক ও সেবামুখী কারাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগে কারাগারের পরিবেশে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা ধরে রাখতে নিয়মিত তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
কারাবন্দিদের স্বজনদের প্রত্যাশা, বর্তমান জেল সুপার মোঃ ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকলে কক্সবাজার জেলা কারাগার দেশের অন্যতম সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব কারাগারে পরিণত হবে।