কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোগীদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে ওষুধ কোম্পানির ভিজিটররা!
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর) বা ভিজিটরদের দীর্ঘদিনের দৌরাত্ম্য ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রোগীদের ভোগান্তির মধ্যেই চিকিৎসকদের কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা এবং সেই অনিয়মের ভিডিও ধারণ করায় দৈনিক আজকের দেশবিদেশ পত্রিকার প্রতিবেদক জয় বৈদ্যর ওপর হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি হাসপাতালজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগ (আউটডোর) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সাংবাদিক জয় বৈদ্য হাসপাতালের আউটডোরে অবস্থান করছিলেন। এ সময় কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির একাধিক এমআর রোগীদের দীর্ঘ সারি ও ভিড় উপেক্ষা করে, অনেককে ধাক্কা দিয়ে চিকিৎসকদের কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পুরো বিষয়টি সাংবাদিক জয় বৈদ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কয়েকজন এমআর।
অভিযোগ রয়েছে, ভিডিও ধারণে বাধা দিয়ে তারা সাংবাদিকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সংঘবদ্ধভাবে তাকে ঘিরে ধরে হেনস্তা করেন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ সময় হাসপাতালজুড়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে রোগীর স্বজন, উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও হাসপাতালের কর্মরত ব্যক্তিরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
হামলার শিকার সাংবাদিক জয় বৈদ্য বলেন, আমি সম্পূর্ণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলাম। দুপুরের দিকে সদর হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে একাধিক ওষুধ কোম্পানির এমআর হাতে উপহার সামগ্রী নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। ৩২৪ নম্বর কক্ষে তখন ৩০ জনেরও বেশি রোগী অপেক্ষমাণ ছিলেন। কিন্তু রোগীদের ধাক্কা দিয়ে কয়েকজন এমআর চিকিৎসকের কক্ষে ঢ়ুকে আবার বের হয়ে আসেন। বিষয়টি জনস্বার্থে আমি ভিডিও ধারণ করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার ওপর চড়াও হয়। প্রথমে তর্ক-বিতর্কে জড়ায়, পরে আমাকে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করে।
তিনি আরও বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিকের ওপর এ ধরনের হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
ঘটনার সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী ও স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওষুধ কোম্পানির এমআরদের কারণে হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে চলাচলই কঠিন হয়ে পড়ে। তারা রোগীদের গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসকদের কক্ষে ঢোকার জন্য ধাক্কাধাক্কি করে। অনেক সময় মনে হয় হাসপাতালটি যেন রোগীদের নয়, এমআরদের দখলে। এভাবে চলতে থাকলে রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং হাসপাতালের পরিবেশ আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠবে। তাই হাসপাতালের ভেতরে এমআরদের অবাধ প্রবেশ অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মংটিংঞো বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ওষুধ কোম্পানির এমআরদের হাসপাতালে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে তারা ফারিয়া নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সীমিত অনুমতি নিয়েছেন। সেই অনুমতিপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, রোগী থাকাকালীন কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকদের ভিজিট করা যাবে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের চিকিৎসকদের কক্ষে প্রবেশের কোনো অনুমতি দেয়নি। যদি কেউ নিয়ম ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে কথা বলা হবে।
এদিকে, সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকরা তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা শুধু ব্যক্তি সাংবাদিকের ওপর আঘাত নয়, এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহের সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করার শামিল। তারা অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির এমআরদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ