চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মঘণ্টা যথাযথভাবে পালন না করা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং নৈতিক স্খলনসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকরা।অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অফিসের নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা হলেও ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দ নিয়মিত সময়মতো কার্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। স্থানীয় নাগরিক ও উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, অনেক দিন তিনি সকাল ১১টা বা দুপুরের আগে কার্যালয়ে আসেন না। এতে দূর-দূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।স্থানীয় ভুক্তভোগী নাগরিক ও ইউএনও কার্যালয়ের কর্মচারীদের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে সংবাদমাধ্যমের একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি লোহাগাড়ায় সরেজমিনে অবস্থান করে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে দেখা যায়, এক নারী সকাল ৯টার আগেই ইউএনও কার্যালয়ে এসে অপেক্ষা করছেন। বেলা ১১টা পার হলেও ইউএনওর দেখা না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। নুর নাহার বেগম নামের ওই নারী বলেন, তিনি জরুরি পারিবারিক সমস্যা নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ, লোহাগাড়ার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার দরজায় পৌঁছানো তো দূরের কথা, তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করাটাই যেন সাধারণ মানুষের জন্য এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য, অপরাধের খবর কিংবা জরুরি প্রশাসনিক সহায়তার প্রয়োজনেও সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও অনেক সময় কোনো প্রতিক্রিয়া মেলে না বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে অপরাধের তথ্য বা নাগরিকের জরুরি অভিযোগ দ্রুত প্রশাসনের নজরে আনার স্বাভাবিক পথটিও অনেকের কাছে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে যদি জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষেরই যোগাযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের জবাবদিহি ও জনসেবার বাস্তব চিত্রটি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? সরকারি বাসভবনে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ: ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে সরকারি বাসভবনে গভীর রাত পর্যন্ত গান-বাজনার আসর বসানো এবং মাদক ও মদ্যপানের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অভিযোগ করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বাসভবনের একটি কক্ষে নিয়মিত গান-বাজনার আয়োজন করা হয় এবং সেখানে বহিরাগতদের যাতায়াত রয়েছে। একই সঙ্গে ওই বাসভবনে ইয়াবা সেবন ও বিদেশি মদ্যপানেরও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মচারী।রাতে বান্দরবান যাতায়াতের অভিযোগ: ইউএনও কার্যালয়ের এক কর্মী ও সরকারি গাড়ির চালকের বরাত দিয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দ প্রায়ই গভীর রাতে লোহাগাড়ার পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত করেন। তাদের দাবি, এসব সফরের সঙ্গে কোনো দাপ্তরিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নেই এবং সেখানে মদ্যপানের আসর বসে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাতের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি পরদিন দেরিতে অফিসে আসেন। এ বিষয়ে কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ডোপ টেস্টের দাবি: এদিকে ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে ওঠা মাদক সেবনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকদের অনেকে। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা। পরীক্ষায় মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযানের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ: অবৈধ বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা, পাহাড় নিধন ও মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়ার পর অভিযান পরিচালনার আগেই সংশ্লিষ্টদের কাছে খবর পৌঁছে যায় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, প্রশাসনের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই ইউএনওর ড্রাইভার সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয় ফলে অভিযুক্তরা সরে যান। এভাবে তথ্য ফাঁসের কারণে কার্যকর অভিযান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারীদের ক্ষোভ: ইউএনও কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তারা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য অফিসের বাইরে গেলেও তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করা হয়। অথচ ইউএনও নিজেই নিয়মিত দেরিতে অফিসে আসেন বলে তাদের দাবি।এক কর্মচারী বলেন, আমরা নিজেদের প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য অফিসের বাইরে গেলে আমাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা হয়। অথচ স্যার নিজে অনেক সময় দেরিতে অফিসে আসেন। অফিসে এলেও মানুষের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেন।বদলি নিয়ে প্রশ্ন: এর আগে গণমাধ্যমে ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসনের দুই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, মূল অভিযোগের তদন্ত না করে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। তবে এসব বদলির সঙ্গে অভিযোগ আড়াল বা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় নাগরিকরা ইউএনওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।ইউএনওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ হোসাইনী বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।তিনি আরও বলেন, সরকারি পদ ব্যবহার করে দুর্নীতি বা অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন অভিযোগগুলোর বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করার পাশাপাশি মেসেজও পাঠানো হয়। এ ছাড়া প্রতিবেদক সরাসরি তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তবে এ সময়ের মধ্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ বা বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, সরকারি দপ্তরের নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তাদের অবশ্যই অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে। বিষয়টি আপনাদের কাছ থেকে জানার পর আমাদের নজরে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে অফিস করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন, সরকারি আইন ও নির্দেশনা সবাইকে মেনে চলতে হবে। কোনো অভিযান পরিচালনার তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। সরকারি বাংলোয় গান-বাজনার আসর বসানোসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে অভিযোগগুলো জেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মঘণ্টা যথাযথভাবে পালন না করা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং নৈতিক স্খলনসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকরা।অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অফিসের নির্ধারিত সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা হলেও ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দ নিয়মিত সময়মতো কার্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। স্থানীয় নাগরিক ও উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, অনেক দিন তিনি সকাল ১১টা বা দুপুরের আগে কার্যালয়ে আসেন না। এতে দূর-দূরান্ত থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।স্থানীয় ভুক্তভোগী নাগরিক ও ইউএনও কার্যালয়ের কর্মচারীদের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে সংবাদমাধ্যমের একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি লোহাগাড়ায় সরেজমিনে অবস্থান করে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে দেখা যায়, এক নারী সকাল ৯টার আগেই ইউএনও কার্যালয়ে এসে অপেক্ষা করছেন। বেলা ১১টা পার হলেও ইউএনওর দেখা না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। নুর নাহার বেগম নামের ওই নারী বলেন, তিনি জরুরি পারিবারিক সমস্যা নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ, লোহাগাড়ার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার দরজায় পৌঁছানো তো দূরের কথা, তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করাটাই যেন সাধারণ মানুষের জন্য এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য, অপরাধের খবর কিংবা জরুরি প্রশাসনিক সহায়তার প্রয়োজনেও সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও অনেক সময় কোনো প্রতিক্রিয়া মেলে না বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে অপরাধের তথ্য বা নাগরিকের জরুরি অভিযোগ দ্রুত প্রশাসনের নজরে আনার স্বাভাবিক পথটিও অনেকের কাছে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে যদি জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষেরই যোগাযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের জবাবদিহি ও জনসেবার বাস্তব চিত্রটি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? সরকারি বাসভবনে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ: ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে সরকারি বাসভবনে গভীর রাত পর্যন্ত গান-বাজনার আসর বসানো এবং মাদক ও মদ্যপানের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অভিযোগ করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বাসভবনের একটি কক্ষে নিয়মিত গান-বাজনার আয়োজন করা হয় এবং সেখানে বহিরাগতদের যাতায়াত রয়েছে। একই সঙ্গে ওই বাসভবনে ইয়াবা সেবন ও বিদেশি মদ্যপানেরও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মচারী।রাতে বান্দরবান যাতায়াতের অভিযোগ: ইউএনও কার্যালয়ের এক কর্মী ও সরকারি গাড়ির চালকের বরাত দিয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দ প্রায়ই গভীর রাতে লোহাগাড়ার পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত করেন। তাদের দাবি, এসব সফরের সঙ্গে কোনো দাপ্তরিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নেই এবং সেখানে মদ্যপানের আসর বসে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাতের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি পরদিন দেরিতে অফিসে আসেন। এ বিষয়ে কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ডোপ টেস্টের দাবি: এদিকে ইউএনও বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বিরুদ্ধে ওঠা মাদক সেবনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকদের অনেকে। তাদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা। পরীক্ষায় মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযানের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ: অবৈধ বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা, পাহাড় নিধন ও মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়ার পর অভিযান পরিচালনার আগেই সংশ্লিষ্টদের কাছে খবর পৌঁছে যায় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, প্রশাসনের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই ইউএনওর ড্রাইভার সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয় ফলে অভিযুক্তরা সরে যান। এভাবে তথ্য ফাঁসের কারণে কার্যকর অভিযান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারীদের ক্ষোভ: ইউএনও কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তারা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য অফিসের বাইরে গেলেও তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করা হয়। অথচ ইউএনও নিজেই নিয়মিত দেরিতে অফিসে আসেন বলে তাদের দাবি।এক কর্মচারী বলেন, আমরা নিজেদের প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য অফিসের বাইরে গেলে আমাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা হয়। অথচ স্যার নিজে অনেক সময় দেরিতে অফিসে আসেন। অফিসে এলেও মানুষের ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেন।বদলি নিয়ে প্রশ্ন: এর আগে গণমাধ্যমে ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসনের দুই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, মূল অভিযোগের তদন্ত না করে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে। তবে এসব বদলির সঙ্গে অভিযোগ আড়াল বা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় নাগরিকরা ইউএনওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।ইউএনওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ হোসাইনী বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।তিনি আরও বলেন, সরকারি পদ ব্যবহার করে দুর্নীতি বা অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন অভিযোগগুলোর বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দের বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করার পাশাপাশি মেসেজও পাঠানো হয়। এ ছাড়া প্রতিবেদক সরাসরি তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। তবে এ সময়ের মধ্যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ বা বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, সরকারি দপ্তরের নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তাদের অবশ্যই অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে। বিষয়টি আপনাদের কাছ থেকে জানার পর আমাদের নজরে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে অফিস করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন, সরকারি আইন ও নির্দেশনা সবাইকে মেনে চলতে হবে। কোনো অভিযান পরিচালনার তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। সরকারি বাংলোয় গান-বাজনার আসর বসানোসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে অভিযোগগুলো জেলা প্রশাসনের নজরে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
