মহেশখালীর কালারমারছড়াজুড়ে রশিদ মিয়ার আতংক
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা উপজেলার আলোচিত ইউনিয়ন কালারমারছড়া। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এই জনপদে এখন সবচেয়ে আতঙ্কের নাম রশিদ মিয়া। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জলদস্যুতা, দখলবাজি, মানবপাচার থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন-এমন কোনো অপরাধ নেই, যার সঙ্গে তার নাম জড়ায়নি।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ভুক্তভোগী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এলাকায় অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে পূর্ব ফকিরজুম পাড়ার মোহাম্মদের ছেলে রশিদ মিয়া। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিতে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতীতে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার আশ্রয়ে থেকে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালালেও বর্তমানে স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্যে দাপট দেখিয়ে চলছেন তিনি। একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে চলাফেরা করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালারমারছড়ার আলোচিত জবল হত্যাকাণ্ডসহ অন্তত তিনটি হত্যাকাণ্ডে রশিদ মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে তিনি সাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতি এবং জলদস্যুতার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সোনাদিয়াকেন্দ্রিক জলদস্যু চক্রের একটি অংশকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় জেলেরা জানান, তার বাহিনীর সদস্যরা মাছ ধরার ট্রলার ও বোটে হামলা চালিয়ে লুটপাট করে। বাধা দিলে জেলেদের মারধর ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি হোয়ানকের পশ্চিম উপকূল থেকে একটি মাছ ধরার বোট ছিনতাইয়ের ঘটনাতেও তার বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়ক ও উপকূল দুই জায়গাতেই সক্রিয় রশিদের বাহিনী। ব্যবসায়ী, জেলে ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পূর্ব ফকিরজুম পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে রশিদ বাহিনী। সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। বিশেষ করে নারীরা আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
রশিদ মিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিচার-সালিশের কথা বলে কিংবা নানা কৌশলে নারীদের ডেকে এনে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের পরিবার দাবি করেছে, এসব ঘটনার কারণে অনেক সংসার ভেঙে গেছে এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বহু নারী। তবে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অধিকাংশ পরিবার প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অপরাধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন রশিদ মিয়া। এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি কক্সবাজার শহরেও দামী ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসপিএম প্রকল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম লুটপাট করে নিজের বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে।
কালারমারছড়ার বাসিন্দাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এলাকাবাসী দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ ও রশিদ মিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রশিদ মিয়ার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুস সোলতান বলেন, মহেশখালী উপজেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বদা সতর্ক ও তৎপর রয়েছে। সমাজে যারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, মাদক, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
তিনি আরও বলেন, ‘দাগি অপরাধী, পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে মহেশখালী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জনগণের জানমাল রক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
ওসি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি। কেউ অপরাধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দিলে তা গুরুত্বসহকারে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মহেশখালীকে অপরাধমুক্ত রাখতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ