উখিয়ায় সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, একই পরিবারের ৩ জনের হাতে ৩ ডিলারশিপ!
প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় রাসায়নিক সারের ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। একই পরিবারের দুই ভাই ও এক জামাতাকে রাজাপালং ও রত্নাপালং ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় কৃষক, ডিলার প্রত্যাশী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত একই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, প্রভাব বিস্তার এবং সার নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় সারের অবৈধ পাচারের ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তারা ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও কঠোরভাবে যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজাপালং ইউনিয়নের ডিলার আহাম্মদ কবির, তার ভাই শামসুল আলম এবং আহাম্মদ কবিরের জামাতা কামরুল ইসলাম। এই তিনজনের হাতে উখিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের তিনটি ডিলারশিপ চলে যাওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, রাজাপালং ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে সারের ডিলার হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন আহাম্মদ কবির। তিনি স্থানীয় জামায়াত নেতা নামে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে অতীতে মিয়ানমারে এক ট্রাক সার পাচারের অভিযোগও রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় আহাম্মদ কবিরের আপন ভাই শামসুল আলমকে পার্শ্ববর্তী রত্নাপালং ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।
নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রথম প্রকাশিত গেজেটে উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির ১ নম্বর সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী ছিলেন রাজাপালং ইউনিয়নে সাইফুর রহমান। পরবর্তী সময়ে তার নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সেখানে আহাম্মদ কবিরের জামাতা কামরুল ইসলামকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তার দোকান ও গুদাম রাজাপালং ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৭ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় দেখানো হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ডিলার নিয়োগে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, একই পরিবারের দুই ভাই ও এক জামাতার হাতে রাজাপালং ও রত্নাপালং ইউনিয়নের তিনটি ডিলারশিপ চলে যাওয়ায় সার ব্যবসায় একক প্রভাব তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একটি পরিবারের হাতে একাধিক ডিলারশিপ কেন্দ্রীভূত হলে তারা বাজারে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এতে প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্য মূল্যে সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তাদের আশঙ্কা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি কিংবা প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে সার বিতরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। উখিয়া সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় কৃষি উপকরণ, বিশেষ করে রাসায়নিক সার অবৈধভাবে সীমান্তের ওপারে পাচারের আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকেরা মনে করছেন।
তৃণমূলের কয়েকজন কৃষক বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় উখিয়া থেকে মিয়ানমারে সার পাচারের ঝুঁকি সবসময়ই বেশি। যাদের বিরুদ্ধে অতীতে সার পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের হাতেই আবার সার বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি পরিবারের হাতে সার ব্যবসার বড় অংশ চলে গেলে আমরা সাধারণ কৃষকরা ন্যায্য মূল্যে সার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত।
তারা আরও বলেন, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু আবেদনকারীর কাগজপত্র নয়, তার পারিবারিক সম্পর্ক, পূর্বের ব্যবসায়িক রেকর্ড, সার বিতরণের সক্ষমতা এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা পাচারের অভিযোগ রয়েছে কি না-এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি সুপারিশ প্রদান করেছে। তবে নীতিমালায় একটি বিষয় স্পষ্ট-নতুন আবেদনকারীরা পুরাতন ডিলারের আয়ের ওপর নির্ভরশীল কি না, সেটি দেখতে হবে। তারা যদি পৃথক পরিবার বা স্বতন্ত্র হন এবং তদন্ত কর্মকর্তা যদি উপযুক্ত মনে করেন, তাহলে নিয়োগে কোনো আইনি বাধা থাকে না।
এদিকে একই পরিবারের তিন সদস্যের হাতে একাধিক ডিলারশিপ যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন উখিয়ার সচেতন মহল। বিশেষ করে প্রথম গেজেটে শীর্ষ সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম বাদ দেওয়ার কারণ, পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত তালিকায় পরিবর্তন এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ