উখিয়ায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আউটলেট থেকে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা আত্মসাত, আটক ২
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি আউটলেট এজেন্ট শাখা থেকে ২১ গ্রাহকের জমা করা ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আউটলেটটির এজেন্ট মালিকসহ দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে ওই আউটলেটের আরও অনেক গ্রাহক তাঁদের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন।
এ ঘটনায় পালংখালী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন। এতে আউটলেটটির এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন (৬৮), ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম (২১), ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ (৩২), অংশীদার মালিক বেলাল উদ্দিন (৫২), মো. ইউছুপ (৩১), মো. ইছহাক (৩২), মো. আব্দুল্লাহ (৩৩), ইফতেকার উদ্দিন (৩৫) ও জহির উদ্দিন (৪২)সহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের দিকে উখিয়ার পালংখালী বাজারের ইয়াকুব-মোস্তফা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আউটলেট এজেন্ট হিসেবে কার্যক্রম শুরু হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে অভিযুক্তদের পূর্বপরিচয় থাকায় গ্রাহকেরা সরল বিশ্বাসে ওই আউটলেটে হিসাব খুলে নিয়মিত টাকা জমা ও লেনদেন করতেন।
বাদী আনোয়ার ফয়সাল আরিফের দাবি, তাঁর নিজের হিসাবেই ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা ছিল। এ ছাড়া এজাহারে উল্লেখ করা ২১ গ্রাহকের বিভিন্ন হিসাবে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ছিল। সব মিলিয়ে এসব হিসাবে ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আমিরুল ফয়েজের ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, তামজিদ ফয়েজের ১০ লাখ ৫২ হাজার টাকা, রেহেনা আক্তারের ৫ লাখ টাকা, মর্জিনা বেগমের ১৪ লাখ টাকা, আনোয়ার হোসেনের ৮০ হাজার ৯৫০ টাকা, মো. ইউছুপের ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা, মো. ইউনুছের ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, নুরুল বশরের ৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা, খতিজাতুল কোবরার ১০ লাখ টাকা, ফাতেমা বেগমের ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, খাইরুল বশরের ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা, রফিক উদ্দিনের ৭৪ হাজার টাকা, আনোয়ারা বেগমের ৮ লাখ ৪ হাজার ৩১৫ টাকা, মো. সোহেলের ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩০৮ টাকা, কাদের হোসেনের ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা, নুর নাহার বেগমের ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা, রহিমা খাতুনের ৫ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা, ছৈয়দ আলমের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মো. শাহজাহানের ৯ লাখ টাকা, শফিকুর রহমানের ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং রুনা আক্তারের ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৭১ টাকা জমা ছিল।
গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে আউটলেটের কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে তাঁরা দেখতে পান, তাঁদের জমা করা অর্থের সঙ্গে হিসাবে থাকা টাকার মিল নেই। কোনো কোনো হিসাবে মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেখানো হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
গ্রাহক আমিরুল ফয়েজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই আউটলেটে টাকা জমা করে আসছিলেন। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে তাঁকে নানা অজুহাতে টাকা দেওয়া হয়নি। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে জমা করা টাকার সঙ্গে হিসাবের অমিল দেখতে পান তিনি।
আরেক গ্রাহক রুনা আক্তার বলেন, বিশ্বাস করে ব্যাংকের ওই আউটলেটে টাকা জমা রেখেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর হিসাবে জমা করা পুরো টাকা নেই। তিনি সঠিক হিসাব যাচাই করে টাকা ফেরতের দাবি জানান।
গ্রাহক খতিজাতুল কোবরা জানান, তিনি ওই আউটলেটে ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। পরে জানতে পারেন, তাঁর মতো আরও অনেক গ্রাহকের টাকাও আটকে আছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, গ্রাহকদের জমা করা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্তরা সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে গ্রাহকেরা জমার রসিদ ও হিসাব পর্যালোচনা করে অভিযোগ করেন, আউটলেটের মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পরস্পর যোগসাজশে হিসাবের বই, জমার রসিদ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা এন্ট্রি তৈরি করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, গ্রাহকদের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অন্য হিসাবগুলোতে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বাদী আনোয়ার ফয়সাল আরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে তিনি ও কয়েকজন সাক্ষী আউটলেট কার্যালয়ে গিয়ে তাঁদের জমা করা ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা ফেরত চান। এ সময় অভিযুক্তদের সঙ্গে তাঁদের তর্ক হয়।
একপর্যায়ে বাদী ও সাক্ষীরা হাকিম উদ্দিন ও তাহসিন ইসলামকে আটক করেন। এ সময় অপর অভিযুক্তরা কৌশলে কার্যালয় থেকে বের হয়ে পালিয়ে যান।
পরে স্থানীয় লোকজন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে উখিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক দুজনকে হেফাজতে নেয়। পরে তাঁদের উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাকিম উদ্দিনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাঁকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসক। পরে পুলিশ তাঁকে সেখানে নিয়ে যায়।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, পালংখালীতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি আউটলেট শাখায় গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বুধবার দুপুরে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। এজাহারে আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আউটলেটটির ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ ও অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক বাংলাদেশ